রবিবার ১৩, সেপ্টেম্বর ২০২৬

১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:২৭ এএম

কম্বোডিয়ার সাইবার স্ক্যাম সেন্টার থেকে চার‌দিনে দেশে ফিরেছেন ২২১ জন

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৭ জুন ২০২৬, ১২:৫০ পিএম

1697

কম্বোডিয়ার কুখ্যাত বিভিন্ন সাইবার স্ক্যাম কম্পাউন্ড (অনলাইন প্রতারণা কেন্দ্র) থেকে উদ্ধার হওয়া আরও ৭৮ জন ভাগ্যবিহত বাংলাদেশি নাগরিক শূন্য হাতে দেশে ফিরেছেন। গতকাল মঙ্গলবার (১৬ জুন) দিবাগত গভীর রাতে থাই এয়ারওয়েজের একটি বিশেষ বাণিজ্যিক ফ্লাইটে তারা ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসে পৌঁছান।

অভিবাসন খাতের সংশ্লিষ্ট সরকারি ও বেসরকারি তথ্য অনুযায়ী, এ নিয়ে গত টানা চার দিনে কম্বোডিয়ার ওইসব ভয়ঙ্কর দাসত্ব ক্যাম্প বা সাইবার স্ক্যাম কম্পাউন্ড থেকে মোট ২২১ জন বাংলাদেশি নাগরিককে উদ্ধার করে দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হলো।

বিগত তিন দিনের ধারাবাহিকতায় গতকাল রাতে ফেরত আসা এই ৭৮ জন ভুক্তভোগীকেও বিমানবন্দরে নামার পর সিভিল অ্যাভিয়েশন সিকিউরিটির (এভিসেক) সার্বিক সহযোগিতায় জরুরি খাবার, প্রাথমিক মানসিক কাউন্সিলিং এবং নিরাপদে নিজ নিজ বাড়িতে পৌঁছানোর জন্য প্রয়োজনীয় জরুরি অর্থ সহায়তা প্রদান করেছে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম।

ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম ও ইয়ুথ প্ল্যাটফর্মের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান এই আন্তর্জাতিক মানবপাচার চক্র নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ‘সাইবার স্ক্যামিং নিয়ে দেশের সাধারণ মানুষ ও চাকরিপ্রার্থীদের মাঝে এখনই ব্যাপক সচেতনতা তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি। এটি আধুনিক যুগে মানবপাচারের সবচেয়ে ভয়াবহ ও আধুনিক এক মরণফাঁদ। দেশে কম্পিউটার বা তথ্যপ্রযুক্তিতে দক্ষ তরুণদের ভালো বেতনে আইটি চাকরির লোভনীয় প্রলোভন দিয়ে সম্পূর্ণ অবৈধভাবে বিদেশে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর কম্বোডিয়া বা মিয়ানমারের দুর্গম এলাকার এসব স্ক্যাম কম্পাউন্ডে আটকে রেখে তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ জোরপূর্বক আন্তর্জাতিক অনলাইন প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হতে বাধ্য করা হতো।’

তিনি আরও জানান, ‘বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ ইউরোপের বিভিন্ন উন্নত দেশের ধনী নাগরিকদের টার্গেট করে অনলাইন ক্রিপ্টোকারেন্সি বা ব্যাংকিং জালিয়াতির কাজে এই তরুণদের ব্যবহার করা হতো। চক্রের দেওয়া দৈনিক বা সাপ্তাহিক লক্ষ্য (টার্গেট) পূরণে কোনো কর্মী ব্যর্থ হলে, তাঁর ওপর নেমে আসতো অমানুষিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন।’

শরিফুল হাসান আরও তথ্য দেন যে, সম্প্রতি কম্বোডিয়ার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আন্তর্জাতিক চাপে কয়েকটি স্ক্যাম কম্পাউন্ডে আকস্মিক চিরুনি অভিযান পরিচালনা করলে এই বাংলাদেশিদের উদ্ধার করা সম্ভব হয়। মাত্র চার দিনে ২২১ জন বাংলাদেশির এভাবে শূন্য হাতে দেশে ফেরত আসা এটাই প্রমাণ করে যে, বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি তরুণ সেখানে এখনো চরম প্রতারণা, বন্দিদশা ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। ইতিমধ্যে ফেরত আসা ভুক্তভোগীদের বেশ কয়েকজন ঢাকার সংশ্লিষ্ট থানায় মানবপাচার আইনে মামলা দায়ের করেছেন। দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উচিত এই আন্তর্জাতিক পাচার চক্রের দেশীয় দালালদের চিহ্নিত করে দ্রুততম সময়ে যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া।

সরকারি প্রতিষ্ঠান জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) অফিশিয়াল পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিগত মাত্র দেড় বছরে বিপুলসংখ্যক অর্থাৎ ১৫ হাজার ৯২১ জন বাংলাদেশি কর্মী আইনি ও আধা-আইনি প্রক্রিয়ায় চাকরি নিয়ে কম্বোডিয়া গমন করেন। তবে ফেরত আসা বাংলাদেশিরা বুকফাটা আর্তনাদ নিয়ে জানান, হাজার হাজার আইটি কর্মী সেখানে কোনো বৈধ চাকরি না পেয়ে দিনের পর দিন অত্যন্ত মানবেতর ও বন্দি জীবনযাপন করছেন। অথচ দেশ ছাড়ার আগে রিক্রুটিং এজেন্সি ও দালালরা সবাইকে কম্বোডিয়ায় বহুজাতিক কোম্পানিতে বিলাসবহুল চাকরির প্রলোভন দেখিয়েছিল।

বিমানবন্দরে ফেরত আসা এক ভুক্তভোগী যুবক তাঁর ভয়ংকর অভিজ্ঞতার বিবরণ দিয়ে বলেন, ‘দেশের দালাল চক্র আমাকে বলেছিল কম্বোডিয়াতে সরাসরি একটি বড় আইটি কোম্পানিতে ডাটা এন্ট্রি অপারেটরের চাকরি হবে। তাদের এই কথায় বিশ্বাস করে বিএমইটির ছাড়পত্র বা স্মার্টকার্ড নিয়ে সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা খরচ করে কম্বোডিয়া যাই। কিন্তু কম্বোডিয়া বিমানবন্দরে নামার পর দালালরা আমাকে মাত্র এক মাসের একটি ট্যুরিস্ট বা ভিজিট ভিসায় দেশে প্রবেশের অনুমতি দেওয়ায়। এরপর তারা আর কোনো কাজের ভিসা দেয়নি এবং আমার পাসপোর্ট কেড়ে নেয়। সেখানে গিয়ে আমি কোনো কোম্পানির অস্তিত্বই খুঁজে পাইনি। পরবর্তীতে সেখানে অবস্থান করা আন্তর্জাতিক রিক্রুটিং এজেন্সির চাইনিজ ও বাংলাদেশি প্রতিনিধিরা বিপুল টাকার বিনিময়ে আমাকে একটি বন্ধুকধারী স্ক্যাম কম্পাউন্ডের ভেতর বিক্রি করে দেয়।’

আরেক ভুক্তভোগী তরুণের বর্ণনা ছিল আরও লোমহর্ষক। তিনি বলেন, ‘আমাদেরকে একটি বিশাল বদ্ধ ভবনে আটকে রেখে চাবুক দিয়ে ও লাঠি দিয়ে নিয়মিত শারীরিক নির্যাতন করা হতো এবং ল্যাপটপের সামনে বসে মার্কিন নাগরিকদের প্রতারণা করতে বাধ্য করা হতো। কেউ এই অনৈতিক কাজ করতে না চাইলে তাকে আন্ডারগ্রাউন্ডের টর্চার সেলে নিয়ে যাওয়া হতো। সেখানে নিয়ে হাত-পা বেঁধে লাথি-ঘুষি মারা ছাড়াও শরীরে তীব্র বৈদ্যুতিক শক (ইলেকট্রিক শক) দেওয়া হতো। সম্প্রতি কম্বোডিয়ার সেনাবাহিনী ও পুলিশ ওইসব স্ক্যাম সেন্টারের চারপাশে ঘেরাও দিয়ে অভিযান শুরু করলে চাইনিজ ও স্থানীয় মাফিয়ারা আমাদের ফেলে রেখে পেছনের দরজা দিয়ে পালিয়ে যায়। এরপর আমরা সেখান থেকে স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তায় মুক্তি পাই।’

বিএমইটি ও ব্র্যাকের তথ্য বিশ্লেষণ করে জানা যায়, এর আগে গত ১২ জুন কম্বোডিয়া থেকে ৩৭ জন, ১৩ জুন ৫৪ জন এবং সর্বশেষ ১৭ জুন এই ৭৮ জন ভুক্তভোগী সম্পূর্ণ শূন্য হাতে ও রিক্ত পোশাকে দেশে ফেরত এসেছেন। কেবল কম্বোডিয়াই নয়, এর আগে চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি মিয়ানমারের একটি সাইবার স্ক্যাম সেন্টার থেকে আটজন এবং বিগত ২০২৫ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর আরও ১৮ জন বাংলাদেশি নাগরিককে একইভাবে উদ্ধার করে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছিল।

মিয়ানমার থেকে ফেরত আসা সেই দলটিকেও ভালো আইটি কাজের প্রলোভন দেখিয়ে প্রথমে থাইল্যান্ডের ব্যাংককে নেওয়া হয়েছিল। এরপর থাইল্যান্ডের দুর্গম সীমান্ত এলাকা মায়েসট হয়ে নদী পার করে জোরপূর্বক মিয়ানমারের বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত নো-ম্যানস ল্যান্ড বা স্ক্যাম জোনে প্রবেশ করানো হয়। সেখানে পৌঁছানোর সাথে সাথেই তাদের পাসপোর্ট, টাকা ও ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে বাইরের দুনিয়ার সাথে যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়েছিল।

ব্র্যাকের মাইগ্রেশন উইং জানিয়েছে, বর্তমানে কম্পিউটার অপারেটর, ডিজিটাল মার্কেটার, কাস্টমার কেয়ার বা কলসেন্টার অপারেটরসহ বিভিন্ন আকর্ষণীয় পদে বিশাল বেতনের লোভ দেখিয়ে চাকরিপ্রার্থীদের আকর্ষণ করতে আন্তর্জাতিক চক্রগুলো বিভিন্ন অনলাইন মাধ্যম (যেমন ভুয়া ওয়েবসাইট, ই-মেইল, ফেসবুক বুস্টিং পেজ, হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ, টেলিগ্রাম চ্যানেল ইত্যাদি) ব্যবহার করে ব্যাপকভাবে প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছে। এরপর ফাঁদে পা দেওয়া তরুণদের সুকৌশলে পর্যটন ভিসায় কম্বোডিয়া বা থাইল্যান্ডে নিয়ে গিয়ে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে স্ক্যামের অন্ধকার দুনিয়ায় ঠেলে দেওয়া হয়। কাজেই বর্তমান পরিস্থিতিতে থাইল্যান্ড, মিয়ানমার, লাওস, ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ায় যেকোনো ধরনের কম্পিউটার ও আইটি সংক্রান্ত চাকরিতে যাওয়ার বিষয়ে দেশের সকল নাগরিক, অভিভাবক ও যুবসমাজকে সর্বোচ্চ সতর্ক ও সচেতন হতে হবে।