প্রকাশিত: ১৭ জুন ২০২৬, ০৬:২১ পিএম
1698
১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:০১ এএম
রাজধানীর আদাবর এলাকায় দিনে-দুপুরে বিকাশ এজেন্টকে কুপিয়ে টাকা ছিনতাই এবং পরবর্তীতে আস্তানায় হানা দেওয়া থানা পুলিশের ওসিসহ দুই কর্মকর্তার ওপর সশস্ত্র হামলার ঘটনার মূল হোতা ও মোহাম্মদপুরের শীর্ষ সন্ত্রাসী ‘এক্সেল বাবু’সহ ‘কব্জি কাটা’ গ্রুপের ৬ সক্রিয় সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে এলিট ফোর্স র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)।
র্যাব জানিয়েছে, রাজধানীর মোহাম্মদপুর-আদাবর এলাকার আতঙ্কের অন্য নাম ‘কব্জি কাটা গ্রুপ’। এই গ্যাংয়ের মূল প্রধান আনোয়ার (বর্তমানে কারাবন্দী) এবং বর্তমান সেকেন্ড-ইন-কমান্ড আবু সাঈদের মূল ‘গুরু’ বা আশ্রয়দাতা হলেন এই এক্সেল বাবু। তার প্রত্যক্ষ ছত্রছায়ায় ও রাজনৈতিক আশ্রয়ে এই গ্যাংয়ের সদস্যরা দীর্ঘদিন ধরে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় প্রকাশ্য ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে আসছিল।
গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন ফরিদ উদ্দিন বাবু ওরফে এক্সেল বাবু, কব্জি কাটা গ্রুপের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড আবু সাঈদ, রাশেদ খন্দকার, মো. লিটন, মো. তসির এবং মো. তরিকুল ইসলাম। গতকাল মঙ্গলবার (১৬ জুন) মধ্যরাত থেকে আজ বুধবার ভোর পর্যন্ত রাজধানীর মোহাম্মদপুর, আদাবর এবং মিরপুরের পীরেরবাগ (৬ ফিট) এলাকায় র্যাব-২ এর একাধিক টিম ধারাবাহিক বিশেষ অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করে। এ সময় তাদের হেফাজত থেকে ছিনতাইয়ের কাজে ব্যবহৃত মোটরসাইকেল, ধারালো চাপাতি ও একাধিক মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়।
আজ বুধবার (১৭ জুন) বিকেলে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে অবস্থিত র্যাব মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে র্যাব-২ এর অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি নাঈমুল হাসান এসব তথ্য নিশ্চিত করেন।
ঘটনার বিবরণ দিয়ে র্যাবের এই কর্মকর্তা বলেন, গত মঙ্গলবার (১৬ জুন) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে আদাবর থানাধীন শেখেরটেক-৭ নম্বর রোডের একটি বিকাশের দোকানে আকস্মিক ঢুকে পড়ে একদল সশস্ত্র ছিনতাইকারী। তারা প্রকাশ্য দিবালোকে চাপাতি দিয়ে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে বিকাশ এজেন্টকে গুরুতর আহত করে। এরপর ভুক্তভোগীর কাছে থাকা ক্যাশ প্রায় ৩ লাখ টাকা ও একটি দামি মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নিয়ে দ্রুত পালিয়ে যায়।
তিনি আরও জানান, এই নৃশংস ঘটনার পর সিসিটিভি ফুটেজ ও গোপন তথ্যের ভিত্তিতে আদাবর থানা পুলিশের একটি দল তুরাগ হাউজিং এলাকায় ছিনতাইকারীদের আস্তানায় অভিযান চালায়। এ সময় পুলিশ দেখে ছিনতাইকারীরা দেশীয় অস্ত্র ও চাপাতি নিয়ে পুলিশের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। এতে আদাবর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) জাইদুল ইসলাম এবং এসআই তরুণ মাথায় ও শরীরে গুরুতর আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে রক্তাক্ত হন। এ সময় আত্মরক্ষার্থে পুলিশ পাল্টা গুলি ছুড়লে আমির ও রুবেল নামে দুই ছিনতাইকারী পায়ে গুলিবিদ্ধ হয়। পরবর্তীতে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে গুলিবিদ্ধ দুজনসহ মোট ৪ জন ছিনতাইকারীকে হাতেনাতে আটক করতে সক্ষম হয়। এই ঘটনার পর চক্রের মূল উপড়ে ফেলতে এবং বাকি পলাতকদের ধরতে র্যাব-২ এর গোয়েন্দা দল ছায়া তদন্ত ও নজরদারি বৃদ্ধি করে, যার ফলশ্রুতিতে মধ্যরাতের অভিযানে ‘গুরু’ এক্সেল বাবুসহ এই ৬ জনকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়।
কব্জি কাটা গ্রুপের সঙ্গে এক্সেল বাবুর মূল সম্পৃক্ততার বিষয়ে জানতে চাইলে অতিরিক্ত ডিআইজি নাঈমুল হাসান বলেন, ‘জিজ্ঞাসাবাদে এক্সেল বাবু নিজেই এই গ্যাংয়ের সাথে তার গভীর সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছে। সে মূলত এই বাহিনীর গডফাদার। গ্রুপ প্রধান আনোয়ার ও আবু সাঈদের গুরু সে-ই। এই ধরনের অপরাধী ও গ্যাংস্টারদের পেছনে যারা মূল পৃষ্ঠপোষক বা মাস্টারমাইন্ড হিসেবে কাজ করে, তাদের আমরা যতক্ষণ পর্যন্ত আইনের আওতায় আনতে না পারব, ততক্ষণ এই গ্যাংগুলো বারবার সক্রিয় হতে থাকবে। এ কারণে ঢাকার গ্যাং কালচার ও ছিনতাই নির্মূলে র্যাব এখন থেকে আরও বেশি ‘অ্যাগ্রেসিভ পুলিশিং’ (আক্রমণাত্মক অভিযান) পরিচালনা করবে।’ বর্তমান শীর্ষ নেতা আবু সাঈদের বিষয়ে তিনি বলেন, আনোয়ার গ্রেপ্তার হওয়ার পর পুরো কব্জি কাটা গ্রুপটিকে এই সাঈদ ‘কিং’ বা প্রধান হিসেবে নেতৃত্ব দিচ্ছিল।
রাজধানীতে দিন দিন ছিনতাই ও গ্যাং কালচার বৃদ্ধি পাওয়া এবং অপরাধীদের দ্রুত শাস্তির আওতায় আনার বিষয়ে র্যাবের পদক্ষেপ জানতে চাইলে এই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘সম্প্রতি বাংলাদেশে দ্রুত বিচার নিশ্চিতের একটা বড় উদাহরণ সৃষ্টি হয়েছে। শিশু রামিসা হত্যা মামলায় খুব সংক্ষিপ্ত ও দ্রুততম সময়ের মধ্যে বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞ আদালত অপরাধীদের সাজা নিশ্চিত করেছেন। এই ধরনের কোনো বিশেষ আইনি প্রক্রিয়ায় বা বিশেষ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে যদি এই সব পেশাদার ছিনতাইকারী এবং কিশোর গ্যাং-সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা যেত, তবে দেশের সাধারণ জনগণ আরও বেশি নিরাপদ বোধ করত। আমরা (র্যাব) মূলত অপরাধীদের আটক করি ও তদন্ত করি। আমরা পুরো ক্রিমিনাল জাস্টিস সিস্টেমের একটি অংশ মাত্র। বাকি বিচারিক ব্যবস্থার গতি বাড়াতে সংশ্লিষ্ট উচ্চপর্যায়ের নীতিনির্ধারকেরা ভেবে দেখতে পারেন। দ্রুত সাজা নিশ্চিত হলে দেশ ও সমাজ দ্রুত উপকৃত হবে।’