সারাদেশ

একবেলা খাবার আর ৫০ টাকায় বিকিয়ে যাওয়া মুসার শৈশব

প্রিন্ট
একবেলা খাবার আর ৫০ টাকায় বিকিয়ে যাওয়া মুসার শৈশব

প্রকাশিত : ১৩ জুন ২০২৬, রাত ১১:১৮

বয়স মাত্র নয় বছর। এই বয়সে যেখানে হাতে থাকার কথা রঙিন মলাটের পাঠ্যবই, সেখানে ৯ বছরের শিশু মুসার হাতে শোভা পাচ্ছে ময়লা-কালি মাখা কাপড়ের টুকরো, পানির বালতি আর ভারী সব যন্ত্রাংশ। ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার মাহানপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণীর চটপটে শিক্ষার্থী মুসার প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা থমকে গেছে ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার পঁচিশ মাইল এলাকার মাহানপুর গ্রামের মুসার বাবা একজন বুদ্ধি প্রতিবন্ধী। আর বছরখানেক আগে মা তাকে ফেলে অন্যত্র বিয়ে করে চলে যান। মা-বাবার আশ্রয় হারিয়ে প্রথমে বৃদ্ধ দাদি এবং পরে ফুফু খাদিজা বেগমের সংসারে ঠাঁই হয় মুসার। কিন্তু অন্যের বাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ করা ফুফুর নিজের সংসারে তীব্র অভাব থাকায় বাধ্য হয়েই মুসাকে কাজে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

মুসার বর্তমান কর্মস্থল ঠাকুরগাঁও পুলিশ লাইন এলাকার মহেনের গ্যারেজ। সকাল হতেই শুরু হয় তার হাড়ভাঙা খাটুনি। দূর থেকে পানি টানা, নোংরা গাড়ি ধোয়া থেকে শুরু করে মেকানিকদের সব রকমের ফরমায়েশ খাটতে হয় এইটুকু শিশুকে। গ্যারেজ মালিক মহেন বাবু জানান, মুসার পারিবারিক বাস্তবতা জেনে মানবিক কারণেই তাকে গ্যারেজে কাজে রেখেছেন।

সারাদিন অক্লান্ত পরিশ্রমের বিনিময়ে মুসা পায় মাত্র একবেলা দুপুরের খাবার আর দৈনিক ৫০টি টাকা। সন্ধ্যা নামলে উপার্জিত টাকাটা সে ফুফুর হাতে তুলে দেয়, যার বিনিময়ে জোটে রাতে একটু মাথা গোঁজার ঠাঁই আর সকাল-রাতের খাবার। পড়াশোনার কথা জিজ্ঞেস করতেই মাথা নিচু করে নেয় মুসা। গ্যারেজের কালচে মবিল আর পোড়া তেলের গন্ধ যেন আড়াল করে দিয়েছে তার স্কুলের দিনগুলোকে।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর ঠাকুরগাঁও জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক নাজমুল ইসলাম বলেন, শিশুশ্রম আইনত দণ্ডনীয় হলেও পেটের ক্ষিধের কাছে এই আইন যেন কেবলই কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ। শুধু ঠাকুরগাঁও জেলাতেই গ্যারেজ, হোটেলসহ বিভিন্ন স্থানে কাজ করছে মুসার মতো শত শত শিশু শ্রমিক।

সচেতন মহলের মতে, একবেলা খাবার আর ৫০ টাকার বিনিময়ে বিকিয়ে যাচ্ছে একটি সম্ভাবনা। সরকারি ও সামাজিক সহযোগিতা ছাড়া মুসার মতো শিশুদের সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন গ্যারেজের কালচে ময়লার আস্তরণেই ঢাকা পড়ে যাবে।