সারাদেশ

হাড়কাঁপানো শীতে রাস্তায় কাঁপছিল দুই শিশু, প্রতিবন্ধী ভাইকে আগলে রাখা বোনের দৃশ্য কাঁদাল সবাইকে

প্রিন্ট
হাড়কাঁপানো শীতে রাস্তায় কাঁপছিল দুই শিশু, প্রতিবন্ধী ভাইকে আগলে রাখা বোনের দৃশ্য কাঁদাল সবাইকে

প্রকাশিত : ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫, রাত ২:০৭

ডিসেম্বরের হাড়কাঁপানো শীতের রাত। ঘড়ির কাটায় তখন সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত্রি নামছে। চট্টগ্রামের আনোয়ারার মাজারগেট এলাকার নির্জন সড়কের পাশে জরাজীর্ণ পোশাকে বসে শীতে ঠকঠক করে কাঁপছিল দুটি শিশু। পাশে কেউ নেই। কনকনে ঠান্ডা থেকে বাঁচতে চার বছরের শিশুটি তার দুই বছরের ছোট বাকপ্রতিবন্ধী ভাইকে দুহাতে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরে বসে আছে। 

এমন হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখে থমকে যান অনেকেই, কিন্তু এগিয়ে আসেননি কেউ। শেষ পর্যন্ত মানবতার হাত বাড়িয়ে দেন মহিম উদ্দিন নামের এক সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক।

​গত রোববার (২৮ ডিসেম্বর) সন্ধ্যায় আনোয়ারা উপজেলার বারখাইন ইউনিয়নের মাজারগেট এলাকায় এই অমানবিক ঘটনাটি ঘটে। জন্মদাতা মা-বাবা কিংবা স্বজনরা ‘বোঝা’ মনে করে অসুস্থ এই দুই শিশুকে সড়কের পাশে ফেলে রেখে পালিয়ে যায় বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।

​মমতার অনন্য দৃষ্টান্ত, উদ্ধারকারী মহিম উদ্দিন জানান, সন্ধ্যার পরও শিশু দুটিকে অসহায় অবস্থায় রাস্তার পাশে বসে থাকতে দেখে তিনি এগিয়ে যান। বড় শিশুটির সঙ্গে কথা বলে জানতে পারেন, তাদের কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই। শীতে তাদের অবস্থা ছিল সংকটাপন্ন। এরপর তিনি আর দেরি করেননি। মানবিক তাড়না থেকে শিশু দুটিকে নিজের অটোরিকশায় তুলে সোজা বাড়িতে নিয়ে যান।

​মহিমের স্ত্রী শারমিন আক্তার বলেন, ‘বাড়িতে আনার পর দেখি বাচ্চা দুটির শরীর জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে। ছোট বাচ্চাটি প্রতিবন্ধী। আমরা দ্রুত গরম পানি করে তাদের গোসল করাই এবং খাবার খাওয়াই। পরিচর্যা পাওয়ার পর তারা কিছুটা স্বাভাবিক হয়। মনে হচ্ছে অসুস্থতার কারণেই পাষণ্ড মা-বাবা তাদের এভাবে ফেলে গেছে।’

​কী বলছে শিশুটি, 

উদ্ধার হওয়া চার বছর বয়সী শিশু আয়শা জানায়, তাদের বাড়ি সাতকানিয়া উপজেলার মৌলভীর দোকান এলাকায়। বাবার নাম খোরশেদ আলম এবং মায়ের নাম ঝিনুক আখতার। শিশুটির ভাষ্যমতে, এক খালা তাদের দুজনকে মা-বাবার কাছ থেকে নিয়ে আসেন এবং আনোয়ারার এই সড়কের পাশে বসিয়ে রেখে কৌশলে চলে যান। এরপর দীর্ঘ সময় পার হলেও কেউ তাদের নিতে আসেনি।

​প্রশাসনের পদক্ষেপ,

ঘটনাটি জানাজানি হলে স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। খবর পেয়ে আনোয়ারা থানার সাব-ইন্সপেক্টর মোমেন ঘটনাস্থল ও উদ্ধারকারীর বাড়িতে যান। তিনি জানান, শিশুদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বিভিন্ন থানায় ছবি ও বার্তা পাঠানো হয়েছে যাতে তাদের প্রকৃত অভিভাবকদের খুঁজে বের করা যায় এবং তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া যায়।

​এ বিষয়ে আনোয়ারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তাহমিনা আক্তার বলেন, ‘বিষয়টি অত্যন্ত অমানবিক। সড়কের পাশ থেকে উদ্ধার হওয়া শিশু দুটিকে সমাজসেবা কার্যালয়ের মাধ্যমে সেইভহোমে (নিরাপদ আবাস) পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে। পুলিশ প্রশাসন ও সমাজসেবা কর্মকর্তাকে এ বিষয়ে দ্রুত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’

​কনকনে শীতের রাতে যখন সবাই উষ্ণতার খোঁজে ব্যস্ত, তখন আনোয়ারার এই ঘটনা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল সমাজের এক চরম নিষ্ঠুর বাস্তবতা, একইসঙ্গে মহিম উদ্দিনের মতো মানুষের হাত ধরে বেঁচে থাকা মানবতার গল্প।