১৫৮৪ খ্রিষ্টাব্দে সম্রাট আকবর হিজরি ও সৌরসনের সমন্বয়ে কৃষি ও রাজস্ব আদায়ের সুবিধার্থে তারিখ-ই-ইলাহি বা ফসলি সনের প্রবর্তন করেন। যা কালক্রমে আজকের বঙ্গাব্দ। নক্ষত্র অনুযায়ী বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ থেকে চৈত্র এই বারো মাসের নামকরণ করা হয় প্রাচীন শকাব্দ থেকে। এক সময় চৈত্র সংক্রান্তিতে খাজনা আদায় শেষ করে বৈশাখের প্রথম দিনে ব্যবসায়ীরা হালখাতার মাধ্যমে নতুন হিসাব শুরু করতেন, যা আজও টিকে আছে।
এক সময় নববর্ষ ছিল মূলত কৃষি ও গ্রামকেন্দ্রিক। বাড়িঘর পরিষ্কার করা, নতুন পোশাকে আত্মীয়দের বাড়ি যাওয়া, এবং পিঠা-পায়েসের ধুম ছিল ঘরে ঘরে। মেলার বিনোদনে ছিল জারি-সারি, গম্ভীরা, লাঠিখেলা, পুতুল নাচ ও ঘোড়দৌড়। গ্রামের মানুষ বিশ্বাস করত, বছরের প্রথম দিনটি ভালো কাটলে পুরো বছরই মঙ্গলে কাটবে।
কালের বিবর্তনে নববর্ষের উৎসবে যুক্ত হয়েছে আধুনিকতার ছোঁয়া। গ্রামের মেলা এখন শহরে রূপ নিয়েছে। রমনার বটমূলে ছায়ানটের গান আর চারুকলার মঙ্গল শোভাযাত্রা (বর্তমানে বৈশাখী শোভাযাত্রা) এখন নববর্ষের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ইউনেস্কো কর্তৃক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের স্বীকৃতি পাওয়ার পর এর ব্যাপ্তি এখন বিশ্বজুড়ে। তবে আধুনিকতার ভিড়ে জারি-সারি বা লাঠিখেলার মতো লোকজ উপাদানগুলো কিছুটা ম্লান হয়ে গেছে। পান্তা-ইলিশের ফ্যাশন কিংবা ব্যান্ড সংগীত এখন উৎসবের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
বর্তমান সরকার বাংলা নববর্ষকে জাতীয় উৎসব হিসেবে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ায় এবং উৎসব ভাতার ব্যবস্থা করায় এর উদযাপন এখন বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সরকারি-বেসরকারি দফতরে নিজস্ব ঢঙে উদযাপিত হচ্ছে নববর্ষ।
সভ্যতার চার হাজার বছরের সমৃদ্ধ ইতিহাস আছে আমাদের। উৎসবে আধুনিকতা আসলেও লক্ষ্য রাখতে হবে যেন বিজাতীয় বা বিকৃত সংস্কৃতি আমাদের শিকড়কে গ্রাস না করে। অতীতের ব্যর্থতা মুছে নতুন বছরে সুখ-শান্তি ও সমৃদ্ধির বার্তা বয়ে আনুক বাংলা নববর্ষ এমনটাই প্রত্যাশা সবার।
মতামত