সারাদেশ

একসময়ের জনপ্রিয় জলিধান এখন বিলুপ্তির পথে

প্রিন্ট
একসময়ের জনপ্রিয় জলিধান এখন বিলুপ্তির পথে

প্রকাশিত : ৩০ জুলাই ২০২৬, দুপুর ১:৫৫

বর্ষা মৌসুমে যখন দেশের হাওর, বিল ও নিম্নাঞ্চলের বিস্তীর্ণ কৃষিজমি পানিতে তলিয়ে যায়, তখনও প্রকৃতির প্রতিকূলতাকে জয় করে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকে একটি বিশেষ জাতের ধান। পানির উচ্চতার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়ে ওঠা এই ধান কৃষকদের কাছে পরিচিত জলিধান নামে। একসময় নিম্নাঞ্চলের কৃষকদের জীবিকার অন্যতম ভরসা হলেও আধুনিক কৃষি ব্যবস্থার বিস্তারে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে বাংলার এই ঐতিহ্যবাহী ধান।


কৃষিবিজ্ঞানীদের তথ্য অনুযায়ী, গভীর পানির আমন ধানের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এর কাণ্ড দ্রুত লম্বা হতে থাকে। সাধারণত ৫০ সেন্টিমিটার থেকে এক মিটার বা তারও বেশি গভীর পানিতে এ ধান স্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠতে পারে। এক মিটারের বেশি গভীর পানিতে জন্মানো কিছু জাতকে ভাসমান ধান বা ফ্লোটিং রাইস হিসেবেও চিহ্নিত করা হয়।

বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্য বলছে, জলিধান সাধারণত মার্চ থেকে এপ্রিল মাসে বপন করা হয়। বর্ষাকালে পানির স্তর বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গাছের উচ্চতাও বৃদ্ধি পায় এবং নভেম্বর থেকে ডিসেম্বর মাসে কৃষকের ঘরে ওঠে ফসল।

বিশেষ করে দেশের নিম্নাঞ্চলে, যেখানে বর্ষাকালে দীর্ঘ সময় জলাবদ্ধতা থাকে, সেখানে জলিধান বহু বছর ধরে কৃষকদের জন্য একটি স্বাভাবিকভাবে অভিযোজিত ফসল হিসেবে চাষ হয়ে আসছে। কিন্তু উচ্চফলনশীল ধানের ব্যাপক সম্প্রসারণ, কৃষিজমির ব্যবহার পরিবর্তন এবং কৃষকদের আগ্রহ কমে যাওয়ায় এই দেশীয় ধানের আবাদ এখন আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে।

কৃষি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ভবিষ্যতে আকস্মিক বন্যা ও দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার ঝুঁকি বাড়তে পারে। এমন পরিস্থিতিতে গভীর পানির সহনশীল জলিধান শুধু একটি ঐতিহ্যবাহী ফসল নয়, দেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

তাদের মতে, এখনো দেশের কিছু কৃষক দেশীয় জলিধানের জাত সংরক্ষণ করে চাষ করছেন। এসব জাতের জিনগত বৈশিষ্ট্য কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যতে আরও উন্নত বন্যাসহিষ্ণু ধানের জাত উদ্ভাবনের সম্ভাবনা রয়েছে।

কৃষিবিজ্ঞানী ও সংশ্লিষ্টদের অভিমত, জলিধানের দেশীয় জাত সংরক্ষণ, গবেষণা জোরদার, কৃষকদের প্রণোদনা প্রদান এবং আবাদ সম্প্রসারণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া এখন সময়ের দাবি। তা না হলে প্রকৃতির সঙ্গে অভিযোজনের অনন্য উদাহরণ এই ঐতিহ্যবাহী ধান একদিন শুধু ইতিহাসের পাতায় সীমাবদ্ধ হয়ে যেতে পারে।