মানবসভ্যতায় বিদ্যুতের আবিষ্কার বাষ্প আর কয়লাশক্তিনির্ভর শিল্পবিপ্লবকে এক ঝটকায় টেনে নিয়ে যায় প্রযুক্তির কেন্দ্রে। সূচনা ঘটে আধুনিক সভ্যতার ভিত্তি ‘টেকনো-ইন্ডাস্ট্রিয়াল’ যুগের। ১৮৭৯ সালে বিজ্ঞানী টমাস আলভা এডিসন আমেরিকায় প্রথম যে বৈদ্যুতিক বাতি জ্বালিয়েছিলেন, তার প্রথম স্থায়ী রূপ পেয়েছিল ইংল্যান্ডে। ১৮৮২ সালে এসে বিশ্বে প্রথম বারের মতো বৈদ্যুতিক আলোয় আলোকিত শহরের মর্যাদা পায় নিউ ইয়র্ক। সেই ঘটনার মধ্য দিয়ে শুধু শিল্পের নয়, মানবজীবনের প্রতিটি স্তরে ঘটে যায় অভাবনীয় নবজাগরণ। বিশ্বের প্রতিটি দেশ, নগর যেন অন্ধকার পেরিয়ে ‘আলোর শহর’ হয়ে ওঠার অপেক্ষায় ছিল।
তবে লন্ডনের পরেই তৎকালীন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ শহর কলকাতায় বিজলিবাতি জ্বললেও ঢাকা নগরীকে অপেক্ষা করতে হয়েছে আরও কয়েক বছর। ১৯০১ সালে অপেক্ষার প্রহর শেষে বিজলিবাতির বিস্ময়কর আলোয় রোশনাই হয়ে ওঠে বুড়িগঙ্গা তীরের ঐতিহাসিক আহসান মঞ্জিল। কেরোসিনের লণ্ঠন আর গ্যাসবাতির যুগ পেরিয়ে ঘটে প্রযুক্তিযুগের নবসূচনা। সেই রাতটি ছিল বিজলির জাদুর মতোই ভয়মিশ্রিত রোমাঞ্চকর। বুড়িগঙ্গার এপার-ওপার হাজার হাজার কৌতূহলী চোখে ছিল বিস্ময়। ঢাকাবাসীর কাছে প্রথম সেই আলো একেবারে ‘অলৌকিক’ মনে হয়েছিল। অনেকে ভয়ও পেয়েছিলেন, যদি আগুনের মতো সেই আলো ঘরে লেগে যায়! আবার কেউ কেউ অন্ধকার তাড়ানো সেই অদ্ভুত বাতিকে বলেছিলেন ‘আধুনিক জাদু’।
বিজলিবাতি আসার আগে ব্রিটিশ আমলের ঢাকা ছিল কেরোসিন লণ্ঠনের শহর। ১৮৬০-এর দশকে পৌরসভা গঠিত হলে শহরের জনপথে কিছু কেরোসিন ল্যাম্প পোস্ট বসানো হয়। প্রতি সন্ধ্যায় পৌরসভার নিযুক্ত কর্মচারীরা হাতে জ্বালিয়ে দিতেন সেই বাতিগুলো। ভোরে গিয়ে নিভিয়ে আসতেন। যাদের বলা হতো বাতিওয়ালা। লণ্ঠনে তেল হিসেবে কেরোসিন বা পেট্রোলিয়াম তেল ব্যবহার হতো। বাতাসে যেন বাতি নিভে না যায় সেজন্য রাসায়নিকভাবে তৈরি প্রতিফলক কাচের লণ্ঠন লাগানো থাকত। তবে সেই আলো ছিল দুর্বল ও ঝাপসা। এরপর ঢাকা নবাব পরিবার ও ইংরেজ প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ শহর হিসেবে বেড়ে উঠতে শুরু করলে (১৯১০-১৯৩০) ‘গ্যাসবাতি’ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল।
গ্যাসবাতি জ্বালানো হতো কয়লা বা কাঠ গ্যাসিফিকেশন পদ্ধতিতে উৎপাদিত দাহ্য গ্যাস ব্যবহার করে। ১৯০৮ সালের দিকে ‘ঢাকা গ্যাস ওয়ার্ক’ নামে ছোট প্ল্যান্ট প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, যা প্রথম দিকে নবাব পরিবারের তত্ত্বাবধানে, পরে পৌর প্রশাসনের আওতায় চলে গিয়েছিল। সেই গ্যাস দিয়েই শহরের কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্থান যেমন আর্মেনিয়ান স্ট্রিট, সদরঘাট, লালবাগ, নবাবপুর, হোসেনি দালান ইত্যাদি এলাকায় গ্যাসবাতি স্থাপন করা হয়েছিল। গ্যাসবাতিগুলোর আলো ছিল কেরোসিন লণ্ঠনের চেয়ে অনেক বেশি উজ্জ্বল। বিদ্যুতের আগমনে ১৯৪০-এর দশকে গ্যাসবাতি পুরোপুরি উঠে যায়।
যেভাবে বিদ্যুৎ এলো
ব্রিটিশ শাসনকালে ঢাকা ছিল পূর্ববঙ্গের এক সমৃদ্ধ জেলা সদর। তবে ব্রিটিশরা ১৮৯৯ সালের ১৭ এপ্রিল প্রথম কলকাতায় বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করেছিল। সেই ঘটনার বছর তিনেক পর ঢাকার চতুর্থ নবাব সলিমুল্লাহর উদ্যোগে পুরান ঢাকার বিখ্যাত নবাববাড়িতে প্রথম বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যবস্থা করা হয়। নবাব নিজ খরচে ছোট জেনারেটর স্থাপন করেন। ১৯০১ সালে ৭ ডিসেম্বর শীতের এক ঘন সন্ধ্যায় বোল্টন নামের এক ব্রিটিশ নাগরিক আহসান মঞ্জিলে সুইচ টিপে প্রথম বিদ্যুৎ সরবরাহের সূচনা করেন, যা থেকে নবাবের প্রাসাদ, অতিথিশালা ও আশপাশের কিছু এলাকা আলোকিত হয়। পরে নবাব আহসানউল্লাহর অর্থায়নে অক্টাভিয়াস স্টিল নামে কোম্পানি আহসান মঞ্জিলসহ গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি সড়ক ও পর্যায়ক্রমে কয়েকটি অভিজাত ভবনকে বিদ্যুতের আওতায় আনে। তবে কোম্পানির উত্পাদনক্ষমতা কম থাকায় শুধু অভিজাত এলাকাতেই সরবরাহ সীমাবদ্ধ ছিল।
বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবসাকে নিয়ন্ত্রণে আনতে ব্রিটিশ সরকার ১৯১০ সালে ইন্ডিয়ান ইলেকট্রিসিটি অ্যাক্ট পাশ করেছিল, যার মাধ্যমে ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান বিদ্যুৎ বিতরণের ব্যবসা করার অধিকার পায়। প্রায় এক দশক পর ১৯১৯ সালে ব্রিটিশ কোম্পানি ‘ডেভকো’র মাধ্যমে ঢাকায় সীমিত আকারে বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার প্রথম বাণিজ্যিক বিকাশ শুরু হয়। ১৯৩৩ সালে এসে কোম্পানিটি ঢাকার পরীবাগে প্রায় ছয় মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন ‘ধানমন্ডি পাওয়ার হাউজ’ নির্মাণ করে। যার মাধ্যমে বাণিজ্যিকভাবে বিদ্যুৎ বিতরণ শুরু হয়। ঢাকার বিভিন্ন এলাকার অভিজাত বাসিন্দারা ছিল সেই বিদ্যুতের গ্রাহক। অনেক গবেষকের মতে, ঢাকায় বিংশ শতাব্দীতে বৈদ্যুতিক সড়কবাতি চালু হলেও পূর্ববঙ্গে প্রথম বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী ছিলেন গাজীপুরের ভাওয়াল পরগনার রাজা। উনিশ শতকেই তিনি বিলাত (লন্ডন) থেকে জেনারেটর আমদানি করে রাজবাড়ি আলোকিত করেছিলেন। সেকালে আধুনিকতার ছোঁয়া থেকে যোজন যোজন দূরে থাকা ভাওয়ালবাসীর কাছে যা বিস্ময়বোধের সৃষ্টি করেছিল।
বিজলিবাতির সামাজিক প্রভাব
বিজলিবাতির আলোয় আলোকিত নবাব সলিমুল্লাহর আহসান মঞ্জিল প্রাসাদ শহরের ধনী ও অভিজাতদের কাছে আধুনিকতার প্রতীক হয়ে উঠেছিল। কে এগিয়ে আছে—শক্তি ও প্রযুক্তিতে—সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধির প্রতীক হিসেবে তা পরিমাপের মাপকাঠি হয়ে উঠেছিল। দূরদূরান্ত থেকে হাজারো মানুষ আসত বিদ্যুতের আলোর জাদু দেখার জন্য, যা সামাজিক মিলনস্থল সৃষ্টি করেছিল। প্রথম বারের মতো রাতে একসঙ্গে বাইরে দাঁড়িয়ে আধুনিক প্রযুক্তি উপভোগ করতেন বহু পর্যটক। শিশু থেকে শুরু করে বৃদ্ধ—সব বয়সের মানুষকেই মুগ্ধ করেছিল বিদ্যুতের সেই বিস্ময়কর আলো। তাছাড়া সাংস্কৃতিক ও বিনোদনের আয়োজনও বেড়েছিল। বিজলিবাতি জ্বালানোর ফলে নাটক, নৃত্য ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আরও মনোমুগ্ধকর হতো। বিজলির আলো নতুন বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে শহরের সংস্কৃতিতে প্রবেশ করেছিল। নবাববাড়ির আলো দেখে মানুষ কল্পনা করতে শুরু করেছিল, শহর কেমন আধুনিক হতে পারে। আধুনিক শহুরে চেতনার সূচনা তখনই গড়ে উঠেছিল। স্বাভাবিকভাবে উদ্ভাবনী প্রযুক্তির প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেছিল শহরবাসী। শিশু ও তরুণদের মধ্যে বিদ্যুৎ ও বিজ্ঞান শেখার ঝোঁক বেড়ে গিয়েছিল। বৈজ্ঞানিক কৌতূহল উসকে দিয়েছিল সেই বিজলির আলো।
ডিসি কারেন্ট
ঢাকায় আহসান মঞ্জিলে বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে নবাব সলিমুল্লাহ প্রথম যে জেনারেটরটি স্থাপন করেছিলেন, সেটা ছিল ব্রিটিশ অথবা ইউরোপীয় মডেলের ডিসি জেনারেটর, যা স্থানীয়ভাবে প্রাসাদের বাতিগুলো চালানোর জন্য যথেষ্ট ছিল। তবে দূরদূরান্তে বিদ্যুৎ পাঠাতে সক্ষম ছিল না, যা ছিল ডিসি কারেন্টের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা। সে সময় তারের মাধ্যমে দূরদূরান্তে বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যবস্থা বা এসি কারেন্ট ছিল তুলনামূলকভাবে নতুন ও অনেক দামি প্রযুক্তি। ১৯২০ সালের পর ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শহরের মধ্যে কলকাতা, ঢাকা, রেঙ্গুনে তা চালু হয়েছিল।
ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি (ডিইএসসি) ১৯৩০ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে এসি বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করেছিল, যার মাধ্যমে তারা শহর জুড়ে দীর্ঘ দূরত্বে বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে সক্ষম হয়েছিল। তবে ব্রিটিশ আমলের ঢাকায় বৈদ্যুতিক সংযোগের অংশবিশেষ, তারের নকশা ও জেনারেটরের ইতিহাসের দলিল আজও সংরক্ষিত আছে আহসান মঞ্জিল জাদুঘরে, যা দেখলেই মনে পড়ে যায় ঢাকায় প্রথম বিজলিবাতির বিস্ময়কর সেই রাতের কথা।
মতামত